কলকাতা থেকে শম্পা দাস: চিকিৎসা পুনর্বাসন ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল মেডিকেল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার (এমআরসি)। প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত রবিবার ২১ ডিসেম্বর কলকাতায় আয়োজিত জাতীয় মেডিকেল সম্মেলন ‘এমআরসি ২৫ সামিট ২০২৫’-এর মঞ্চ থেকে পূর্ব ভারতে প্রথমবারের মতো রোবোটিক থেরাপি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর মেডিকেল রিহ্যাবিলিটেশন পরিষেবা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
দিনব্যাপী আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খ্যাতনামা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। সম্মেলনের মাধ্যমে এমআরসির গত আড়াই দশকের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও রোগীকেন্দ্রিক সেবাদর্শনের নানা দিক তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে রোবোটিক থেরাপি ও এআই-নির্ভর রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসার নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি কলকাতা ও পূর্ব ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে। রোগীদের ইতিবাচক ফলাফল ও বাস্তব অভিজ্ঞতা এই আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়াচ্ছে বলেও মত দেন তাঁরা।
এ ছাড়াও সম্মেলনে ফাইব্রোমায়ালজিয়া, পোস্ট-স্ট্রোক ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যখাতে এইচআর প্রযুক্তির ভূমিকা, রিহ্যাবিলিটেশনে এআই ও রোবোটিক্সের ব্যবহার, ব্লাডার রিহ্যাবিলিটেশন ও বোটক্স থেরাপি, বাওয়েল ও যৌন পুনর্বাসন, উন্নত ফলাফলের জন্য টেনোটমি, পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি-সহ বিভিন্ন সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চার্নক হাসপাতালের গ্রুপ সিইও ও আরপিএসজি গ্রুপের ব্র্যান্ড রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রেসিডেন্ট ডা. রূপালি বসু; ইন্ডিয়ান স্পাইনাল ইনজুরিজ সেন্টারের প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল ও ভারত সরকারের প্রাক্তন ডিজিএইচএস ডা. এ. কে. মুখার্জি; এইমস ভুবনেশ্বরের পিএমআর বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. জগন্নাথ সাহ; কোচির অমৃতা হাসপাতালের পিএমআর বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. রবি শঙ্করণ; এইমস পাটনার অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং আইএপিএমআরের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. সঞ্জয় পান্ডে; এসএমএস মেডিকেল কলেজ, জয়পুরের রিহ্যাবিলিটেশন রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক ও পরিচালক এবং আইজেপিএমআরের এডিটর-ইন-চিফ ডা. মৃণাল জোশি; আইপিজিএমইআর ও এসএসকেএম হাসপাতালের পিএমআর বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. রাজেশ প্রামাণিক; ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অব পেইনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও দরদিয়া পেইন ক্লিনিকের পরিচালক ডা. গৌতম দাস; ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পিএমআর বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং এমআরসি ২৫ সামিটের চেয়ারম্যান ডা. বি. কে. চৌধুরী; এবং এমআরসির প্রতিষ্ঠাতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মৌলি মাধব ঘটক।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসকরা তাঁদের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা, গবেষণালব্ধ তথ্য ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ভাবনা তুলে ধরেন। ফলে এই সামিটটি রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা ক্ষেত্রে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমআরসির প্রতিষ্ঠাতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মৌলি মাধব ঘটক বলেন, ‘চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার পরও অনেক রোগী দীর্ঘদিন নানা জটিলতায় ভোগেন—যেমন দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, চিকিৎসা-পরবর্তী সমস্যা বা দৈনন্দিন কাজে সীমাবদ্ধতা। এই অবহেলিত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়েই আমরা চিকিৎসা, সহমর্মিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার মধ্যকার ব্যবধান কমাতে চাই।’
গত ২৫ বছরে আধুনিক প্রযুক্তি, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রোগীকেন্দ্রিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে এমআরসি স্বাস্থ্যখাতে একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছে। ‘এমআরসি ২৫ সামিট ২০২৫’ ছিল সেই দীর্ঘ পথচলারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পাশাপাশি অসংখ্য রোগীর বদলে যাওয়া জীবনের গল্পও উঠে আসে।

